কেউ হারিয়েছে গবা দি পশু, কেউ বা বসত ভিটে l হৈচৈ, কান্না চারিদিকে l
দুঃখিনী হাসু
সোমা দাস
আকাশে কালো মেঘ করেছে l এই বুঝি ঝড় উঠলো, কালো ছায়ায় মুহূর্তে র মধ্যেই যেন সারা পৃথিবী টাকে ঢেকে ফেলেছে l যে যেখানে আছে প্রানপনে বাড়ি ফেরার প্রয়াস চলছে l করিম মাঝি মাছ ধরিবার আশায় পদ্মার অভিমুখে যাত্রা করিবার প্রস্তুতি নিচ্ছে l গলায় গামছা আর মাথায় বাঁশের ছাতা নিয়ে হাঁকছে,, কই গো বাদশার মা, গেলে কোথায়? আমি ঘাটে যা ছ ছি, পুলা ডারে দেইখা রাইখো,,
হাসু,,,, বলি এই ঝড় বাদলে না গেলে হয় না? বড় ডর লাগতাছে বাদশার বাপ্,
করিম,,,,, দূর পাগলী,, ডরের কিছু নাই, আমি যাবো আর আসবো, পুলাডা মাছ ছাড়া খাইতে পারে না ---দেখো না? খাইতে বইয়া ঘ্যান ঘ্যানানি শুরু কইরা দেয়, চিন্তা কইরো না l আমার কিছ ছু হই বো না lগেলাম গো,,,
হাসু,,,,, মানুষ ডারে বুঝানো যায় না, যেডা মনে করবো হেই ডাই করবো, কোন কালে শুনেছে আমার কথা !! ঠাকুর, তুমি দেইখা রাইখো তারে, ওরে রক্ষা কইরো ঠাকুর,, রক্ষা কইরো,,
ঝড়ো হাওয়া য় কিছুটা শীত শীত করছে l গায়ে গামছা জড়িয়ে হাসুর দশ বছরের ছেলে বাদশা মাকে জড়িয়ে ধরে বলছে,,,,,,
ও মা, এই ঝড়ের দিনে বাপেরে যাইতে দিলা কেন?
হাসু,,,,,, তোর বাপ্ কি আমার কথা শুনে? কত কইরা কইলাম,, কে শুনে কার কথা,,
বাদশা,,,,,, তুমি আমারে ডাকলা না কেন? আমি বাপের কোলে উইঠা বইয়া থাকতাম, নামতাম ই না l তখন দেখতা, বাপে আর যাইতে পারতো না l আমার বুদ্ধি টা কেমন ছিলো কও?
হাসু,,,, আমার খুব ডর লাগতাছে রে বাপ্, রাইক্ষস এর মতো মেঘ ডাকতাছে, ঐ দেখ? গোপাল খোঁড়র ঘরের চাল, এই উড়লো বলে,, গাছপালা গুলা আর দাঁড়াইয়া থাকতে পারতাছে না, l ঠাকুর,, তুমি রক্ষা করো, রক্ষা করো l এই ঘর ছাড়া আমাগো র আর কিছুই নাই l এক রত্তি পুলাডা রে লইয়া কই যাইমু !!!
ভয়ে হাসু বৈদ্য এর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে l ছেলে টা কে জড়িয়ে ধরে বাঁশের মাচার উপর শুয়ে রইলো l ঝড়ের দাপটে মর মর করছে জীর্ণ কুটির l হাসু অনবর ত ঈশ্বর কে স্মরণ করে চলেছে l মেঘের গর্জন যত প্রকট হচ্ছিলো,, বাদশা তার মাকে ততোই শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে লাগলো l হাসু বুঝতে পারছিলো,, ছেলে ভয় পাচ্ছে, তাই আঁচল দিয়ে তার সর্বাঙ্গ ঢেকে দিয়ে আরও আটো- সাটো হয়ে পড়ে রইলো l
রাত প্রায় হয়ে আসলো, ঘন অন্ধকার এ নিজেকেও দেখা যাচ্ছে না, বিদ্যুৎ ঝলকানি তে যতটুকু আচ্ করা যায় l বৃষ্টি আর থামছে না, ঘুম ভাঙলো হাসুর, কিন্তু স্বামী তো ফিরলো না, এদিক ওদিক দেখছে,অদৃশ্য আশংকায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে হাসুর, এই ঘুঁটঘুটে অন্ধকারে কোথায় খুজবে স্বামীকে, ছটফট করতে লাগলো একবার ঘরের বাইরে একবার ভেতরে, পায়চারি করছে হাসু, কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না, একা একা বিড়বিড় করছে,,,
হাসু,,,,, আমার মনডা "কু" ডাক তাছে কেন? ওর কোন ক্ষতি হয় নাই তো? কতো কইরা কইলাম যাওনের দরকার নাই, শুনলো ই না, হে ঠাকুর !আমারে পথ দেখাও, এই এক রত্তি পুলা ডারে লইয়া এখন আমি কি করি !!
বাদশা র দিকে তাকিয়ে ভাবছে,,,,
হাসু,,,,,, ও ঘুমাইয়া পড়ছে, এই সুযোগ, আমার এই ভাবে ঘরের মধ্যে বইসা থাকলে হইবো না, বাইরৈয়া পড়ি l
অন্ধকার এর মধ্যেই হাসু খুঁজতে বেরিয়ে পড়লো করিম কে, ঝড়ের রাতে কোথায় খুজবে তা সে নিজেই জানে না, রাস্তায় কাউকে দেখাও যাচ্ছে না, এই ভাবে এদিক ওদিক খুঁজছে পাগলের মতো l
এদিকে বাদশা র ঘুম ভেঙে গেলো l পাশে মা কে দেখতে না পেয়ে মা মা বলে ব্যাকুল হয়ে পড়লো l এতটুকু বাচ্চা, কোন কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না, মা কে দেখতে না পেয়ে ঝড়ের রাতে নিজেই বেরিয়ে গেলো l
মাঝ রাতে বৃষ্টি তে নেয়ে হাসু বাড়ি ফিরলো l বাদশা কে বিছানায় দেখতে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠলো l কিন্তু কোথাও তার দেখা মিললো না l সন্তান হারা মায়ের মন কেঁদে কেঁদে ফিরছে, সন্তান কে খুঁজে পেতে পুনরায় বেরিয়ে পড়লো হাসু l সারারাত দিশেহারা হয়ে খুঁজলো l কিন্তু কোথাও কারোর দেখা মিললো না l ঝড় থেমে গেলো l ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো l মানুষ জন বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায় l
কেউ হারিয়েছে গবা দি পশু, কেউ বা বসত ভিটে l হৈচৈ, কান্না চারিদিকে l
গাছের নীচে অচৈ তন্য হয়ে পড়ে থাকা হাসুর জ্ঞান ফিরলো l কিন্তু বাদশা বা করিম এর দেখা পেলো না l তাই কোন রকম নিজেকে সামলে নিয়ে এজন, অজন কে শুধু তে লাগলো,, হ্যাঁ গো আমার বাদশা কে দেখছো? কাল রাত্তিরে কোথায় যে বাইরৈয়া গেলো খুঁইজা পাইতাছি না l বাদশা র বাপ্ ও ফিরে নাই l মাছ ধইরা আনতে সেই যে গেলো, এখনো আইলো না l
যাকেই সামনে পাচ্ছে তাকেই সাঁড়াশি র মতো ধরছে আর জিজ্ঞেস করছে,, কিন্তু কেউ কোন হদিশ দিতে পারলো না l
এদিকে বেলা বাড়ছে l সারারাত হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে হাসু l মুখ দিয়ে রা বেরুনো র শক্তি নেই l মাঝ পথেই বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে l হঠাৎ ও পাড়ার বিনু দিদি, চিৎকার করে বলছে,,
হাসু,,, হাসু,,,, বলি গেলি কোথায়? সব্বোনাশ হয়ে গেলো রে,, এদিক আয় তাড়াতাড়ি, !
হাসু, পড়ি কি মরি, বিনু দি র ডাকে সাড়া দিয়ে ওর পেছন পেছন ছুটলো পদ্মার ঘাটে l লোকে লোকার ন্য l কেউ একজন ধরা ধরি করে কিছু একটা পাড়ে তুললো মনে হচ্ছে l কিন্তু কি সেটা !লোকের ভিড় ঠেলে সামনে আসতেই যা দেখলো তাতে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলো না হাসু l
কেউ কেউ বলছিলো,, আহারে !কি মিষ্টি ছিলো ছেলেটা, বলি তুমি কেমন মা গো? ছেলের খেয়াল রাখতে পারলে না? যে যেমন ভাবে পারছে বলছে l
হাসু, বাদশা র মৃত দেহের উপর পড়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলো l এদিকে সকলেই বলাবলি করতে লাগলো, বাদশা র বাপ্ কোথায়? শুরু হলো খোঁজাখুঁজি l
ছেলেকে ধরে বিলাপ করছে হাসু l হাসুর বুক ফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো l ছেলের সৎকার এর জন্য জোগাড় যন্ত্র চলছে l কিন্তু করিম কোথায় !!
হন্নে হয়ে খুঁজছে সবাই l হঠাৎ গ্রামের রবিন খোঁড়র ছেলে প্রকাশ মাঝি বলে দৌড়ে এসে বললো, জমিদার এর পোড়া বাড়ির পাশে যে তালগাছ টা রয়েছে, তার কাছেই করিম কাকার মত মনে হলো, উপর হয়ে পড়ে আছে l
এ কথা শুনা মাত্র ই গ্রামের লোক জন ছুটে চললো সেই জায়গায় l এই কি আমাদের করিম!!
সারা শরীর একেবারে ছাঁই বর্ণ হয়ে গেছে যে l প্রতিবেশিদের মধ্যে একজন বলে উঠলো,,
সে তো হবে রে ভাই, বাজ পড়লে এমনই হয় l
পাশাপাশি পিতা পুত্রের চিতা সাজানো হলো l চারদিকে এক রোল ----কি সব্বোনাশ হলো রে, বলি ঠাকুর এতো নির্দয় তুমি হতে পারলে? কেউ কেউ বিলাপ করে কাঁদছে, কিন্তু হাসু একেবারে পাথর হয়ে আছে l মুখে এতটুকু রা শব্দ নেই l পলক পড়ছে না ক্ষনিকের জন্য l শোকে দুঃখে বোবা হয়ে গেছে l পাড়ার গৃহিনী রা কেউ শাখা ভাঙছে, সাদা কাপড় পরাচ্ছে,কিন্তু হাসু সেই একই ভাবে পাথর হয়ে আছে l
শেষ পর্যন্ত নিয়তির পরিহাসকেই সাদরে গ্রহণ করতে হলো l
Post a Comment