বুকের ভেতরটা ধকধক করে ওঠে মঞ্জুলার । বেশ ভয় পেয়ে যায় সে । এমনিতে বেশ ডাকাবুকো ।

 

রথীন্দ্রনাথ রায়

একটুকু ছোঁয়া লাগে

রথীন্দ্রনাথ রায়


সন্ধ্যে হয় হয় । কিছুক্ষণ আগেও আকাশে মেঘ ছিলনা । দেখতে দেখতে একটা কালো মেঘ সারা আকাশটাকে ছেয়ে ফেলল । সঙ্গে অন্ধকার । স্টেশনের এদিকটায় বেশি দোকানপাট নেই । রাস্তায় লোকজন ছিলনা । একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে এল । হয়তো এখনি বৃষ্টি নামবে । তবে এসবে ভয় ছিলনা অতুলের । কারণ ছোট্ট ব্যাগে ছোট্ট ছাতার অস্তিত্ব টের পাচ্ছে সে । সাপটাপের ভয় তার নেই । কারণ ওগুলোকে নিয়ে সে বেশ মজা করতে পারে । তবে আর একটা ভয় আছে  -- তাহল ছিনতাইয়ের । কারণ এরাস্তায় প্রায়ই সেটা হয়ে থাকে । যদিও তার কাছে তেমন কিছু নেই যা পেলে ছিনতাইবাজদের লাভ হবে । 

-- অতুলদা  ? 

অতুল আশ্চর্য । চারপাশে তাকায় সে । শব্দটা যে কোনদিক থেকে এল তা বুঝতে পারেনা । হঠাৎ দেখে ওভারব্রিজ থেকে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে মঞ্জু -- মঞ্জুলা সিকদার । অতি সম্প্রতি ইন্ডিয়ান অয়েলে চাকরি পেয়েছে । শিক্ষিতা, সুন্দরী  , চাকুরিরতা । ব্যাপারটা সহজেই অনুমেয় । সবাই বলে ও নাকি খুব অহঙ্কারী । কমবয়সে ওর সামনে অনেক বীরত্বের কাজ করেছে । তবে ওর মনকে ভেজাতে পেরেছে বলে মনে হয়না । বড্ড দেমাকী মেয়েটা । একটু হাসেনা পর্যন্ত । সেই মঞ্জুলা কাছে এসে বললে  , আমাকে তোমার সাথে নিতে হবে । 

-- এস । 

দুজনে হাঁটতে থাকে । কিছুটা যেতেই অন্ধকার গাঢ় হয় । সেই সঙ্গে মনে হয় ভাদ্রের আকাশটা বুঝি এখনি ভেঙে পড়বে । 

-- মনে হয় বৃষ্টি নামবে । 

-- হয়তো । 

অতুল কথা বলতে উৎসাহ পায়না । কি নিয়ে কথা বলবে ঠিক করতে করতেই কিছু বলা হয়ে ওঠেনা । তাছাড়া মঞ্জুলা আজ বিপদে পড়ে ওর সঙ্গে এসেছে । এমনিতে ওর দিকে ফিরেও তাকায়না । চুপ করে থাকে সে ।

হঠাৎ সোঁ সোঁ করে শব্দ ওঠে । সেই সঙ্গে গাছের মাথাগুলো দুলে ওঠে ।স

-- মঞ্জুলা পা চালাও । ঝড় উঠল ।

মঞ্জুলা শাড়ি সামলে পা চালাতে থাকে । কিন্তু ঝড়ের সাথে পেরে ওঠেনা ।  হঠাৎ কে যেন মাথার ওপরের কালো আকাশটাকে একটা ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দেয় । একটা তীব্র আলো চোখগুলোকে ঝলসে দিয়ে অন্ধকারকে আরো বাড়িয়ে তুলল । না চারপাশে সে রকম কোনও ঘরবাড়ি দেখা গেলনা যে একটু আশ্রয় নেবে । বুকের ভেতরটা ধকধক করে ওঠে মঞ্জুলার । বেশ ভয় পেয়ে যায় সে । এমনিতে বেশ ডাকাবুকো । কিন্তু আজ এই মূহুর্তে বেশ সন্ত্রস্ত । 

-- অতুলদা  ?

-- ভয় নেই । তোমার কাছে ছাতা আছে তো  ? 

-- না । 

-- সে কি  ? তাহলে তো বেশ মুসকিল হবে । বর্ষার সময়ে ছাতা না নিয়ে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়  ? 

মঞ্জুলা কথা বললনা । অন্ধকারে ওর মুখটাও দেখা যায়না । এই ভীষণ দুর্যোগের সময়ে বড্ড বিপদে পড়েছে বেচারা । তাছাড়া মেয়েদের একটা সাধারণ বিপদ তো আছেই । কিছুদূর যেতে না যেতেই বৃষ্টি নামল । বেশ বড় বড় ফোঁটাগুলো । হুলের মতো এসে আছড়ে পড়ছে গায়ে মাথায় পায়ে । ক্রমে আরো, আরো । মুষলধারে বৃষ্টি নামল । অতুল দৌড়াতে পারত । কিন্তু দৌড়ালনা মঞ্জুলার কথা ভেবে । অগত্যা ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে । ততক্ষণে বেশ কিছুটা ভিজে গেছে সে । 

-- মঞ্জুলা এস । 

-- না থাক। একদিন ভিজলে কোনও কষ্ট হবেনা।অন্ধকারে মঞ্জুলাকে দেখতে না পেলেও চলার শব্দে ওর অস্তিত্বের টের পায় অতুল । 

-- সে তো আমারও হবেনা । কিন্তু ছাতাটা যখন রয়েছে  ? 

আর কিছু বলতে পারলনা সে । মঞ্জুলা মেয়ে । তার থেকেও তো ওর বিপদ আসতে পারে  ! প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বন্যপ্রাণীরাও তাদের স্বভাব ভুলে যায় । কিন্তু তারা যে সভ্য মানুষ  ? 

ঝড় বৃষ্টিতে এগোনো যায়না । তারই মধ্যে মঞ্জুলা ভিজতে থাকে । অতুল ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করে মঞ্জুলার হাতে দিয়ে বলে, ধরো ।

-- কি  ? 

-- ছুরি । 

-- কি হবে  ?

-- যদি আমি তোমার শরীরের ওপর হামলা চালাই তাহলে ওটা আমূল বসিয়ে দিও আমার বুকে । 

-- অতুল ? 

তীব্র একটা বিদ্যুতের ঝলকানিতে মাঠঘাট, গাছপালা সবই নজরে আসে । নজরে আসে মঞ্জুলার সিক্ত মুখ । তারপর আবার সব অসীম অন্ধকারে ডুবে যায় । 

-- ছাতার তলায় এস । 

মঞ্জুলা প্রতিবাদ করলনা । অতুলকে সে ছোটবেলা থেকে দেখেছে । কিন্তু আজকের অতুল যেন অন্যরকম । এতক্ষণ সে কত কিছু ভাবল এবং অকারণেই ভিজল । অন্তত মাথাটাকে তো বাঁচাতে পারত  ? ছুরিটা ফেলে দিল সে ।  অন্ধকারে ওর মুখ দেখা যায়না । এত কাছে রয়েছে তবু না । এমনকি ওর শরীরের কোনও অংশও তাকে স্পর্শ করছেনা । হয়তো তাকে ছাতার তলায় জায়গা করে দিতে গিয়ে অতুল নিজে ভিজছে  ! 

-- অতুল  ? 

-- কি  ? 

-- ভিজছনা তো  ? 

-- না ।

আবার সব চুপচাপ । ছাতার বাইরে বৃষ্টির দাপাদাপি । কতক্ষণে থামবে কে জানে  ? হঠাৎ পায়ের ওপর দিয়ে কিছু একটা চলে যেতেই ভয়ে চিৎকার করে ওঠে মঞ্জুলা । 

-- কি হল ?

-- সাপ । 

-- না না, সাপ কেন হবে  ?

অন্ধকারে কিছু দেখা যায়না । সেভাবেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওরা আবার চলতে থাকে । ছোঁয়া বাঁচিয়ে । কিন্তু একবার পা পিছলে যেতেই মঞ্জুলা অতুলকে জড়িয়ে ধরে । হঠাৎ মনে পড়ে অতুল ছেলে এবং সে মেয়ে । ছি ছি, লজ্জায় তার মুখটা আরক্ত হয়ে ওঠে । 

দিনকয়েক পরের কথা । ভুলতে চাইলেও সেই দুর্যোগপূর্ণ রাত্রির কথা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারলনা মঞ্জুলা । অতুলের কথা অন্যভাবে ভাবা যেত । ছোটখাটো একটা অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করে সে । ভালো একটা  চাকরির জন্য চেষ্টা করে বৈকি  ! কিন্তু পায় কৈ  ? মা, বৌদি হ একমাত্র ভাইপো আপ্পুকে নিয়ে ওদের সংসার । বড়দা কি একটা কঠিন অসুখে ভুগে ভুগে গতবছর শীতে মারা যান । তারপর থেকেই অতুলকে সংসার চালাবার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হচ্ছে । 

সেদিন অফিস থেকে ফিরতেই মা বললেন  , অতুলের কথা শুনেছিস  ?

-- কি হয়েছে অতুলের  ? 

আকাশ থেকে পড়ে মঞ্জুলা । অজানা আশঙ্কায় দেহের সমস্ত স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে থাকে । 

ক,দিন আগে থেকেই বাজারের মধ্যে গোলমাল চলছিল । আজ দুপুরের দিকে বোমাবাজি মধ্যে পড়ে অতুলের  ।

 নাঃ '। নিজের অজান্তেই ঠোঁটদুটো কেঁপে ওঠে মঞ্জুলার । বুকের মধ্যেটা কেমন যেন বায়ুশূন্য হয়ে পড়ে । অথচ অতুল তার কেউ না । কিন্তু সেই অতুলই তো ক'দিন আগে সেই দুর্যোগের রাতে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সত্যিকারের বন্ধুর মতো । সেদিন সারারাত  শুধুই অতুলের কথা মনে হল । কিছুমাত্র ঘুমাতে পারলনা । পরদিন সকাল হতেই হাসপাতালে এল । আঘাত তেমন গুরুতর নয় । পিঠের দিকে কিছুটা ঝলসে গেছে । সেজন্য সবসময় ওকে উপুড় হয়েই শুতে হয় । এভাবেই হয়তো আরও কয়েকদিন থাকতে হবে । 

ধীর পায়ে মঞ্জুলা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল । বলল, অবাক হয়ে গেছো, তাই না  ?

-- না মানে  -- 

-- থাক,   আর মানে করতে হবেনা । 

মঞ্জুলা ওর বেডের পাশে একটা টুলের ওপর বসে বলল, একটা কথা বলব, রাগ করবেনা  ? 

নির্বাক বিষ্ময়ে ওর দিকে চেয়ে থাকে অতুল । ক'দিন আগের কথা মনে হয় । যে মেয়েটা তার ছাতার তলায় আসতে ভয় পেয়েছিল আজ সে বলছে, কথা বললে রাগ করবে কিনা  ? আশ্চর্য !

-- কি দেখছ অমনভাবে  ? বলছিলাম কি বনের মোষ না তাড়িয়ে এবার নিজের দিকে মন দাও । 

কখন যে মঞ্জুলা অতুলের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ফেলেছে খেয়াল হয়নি । খেয়াল হল তখন যখন অতুল নিজের থেকেই হাতটা সরিয়ে নিল । 

এরপর দিনকয়েক কেটে গেছে । পিঠের ঘা অনেকটা শুকিয়ে গেছে । হয়তো মঞ্জুলার কথা ভুলেই গেছিল । কিন্তু সেদিন বাজারে বেরোবে এমন সময় মঞ্জুলা ওদের বাড়ি আসে । বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ে অতুল ।  ওদের এই দারিদ্র্য জর্জরিত সংসারে মঞ্জুলাকে কোথায় বসাবে ভেবে পায় না । 

ইতিমধ্যে বাজারে যাওয়া নিয়ে অতুলের সাথে বৌদির একপ্রস্থ ঝগড়া হয়ে গেছে । বৌদি কি একটা বলতে যাচ্ছিল  , এমন সময় মঞ্জুলাকে দেখে আশ্চর্য হয় । 

মঞ্জুলা প্রনাম করে উঠে দাঁড়ায় ।স

-- তোমাকে তো চিনলাম না  ?

-- আমি অমিয়বাবুর মেয়ে ।

-- তাই  ? এস, এস । তোমার কথা ঠাকুরপোর কাছ থেকে অনেক শুনেছি ।

ইতিমধ্যে মা এলেন । তিনি মঞ্জুলাকে লক্ষ্য করেননি । অতুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন  , ওরে অতুল কথাটা শোননা বাবা  -- 

তারপর সামনে মঞ্জুলাকে দেখে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন । মঞ্জুলা ওনাকে প্রনাম করে উঠে দাঁড়ায় । মা ওর চিবুকে হাত দিয়ে বললেন  , ভারি মিষ্টি মেয়ে তুমি মা । 

-- কেমন আছেন মাসিমা  ? মা প্রায়ই আপনার কথা বলেন । 

-- ভালো তো আছি মা । কিন্তু এই ছেলে যে কতোদিন আমাকে ভালো থাকতে দেবে কে জানে  ? 

মনে মনে ভাবেন যদি এমন একটি মেয়েকে অতুলের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারতেন তাহলে হয়তো তাঁর চিন্তা কিছুটা কমত । 

অতুল পাশের ঘরে যায় । এগিয়ে আসে আপ্পু । মঞ্জুলার শাড়ির আঁচল ধরে বলে, আণ্টি কাকুকে বকে দাও তো । কাকু মায়ের কথাও শোনেনা, ঠাম্মার কথাও শোনেনা । 

মঞ্জুলা আপ্পুকে কোলে তুলে নেয় । ও যেন তার কতো আপনজন । তার হৃদয় যার জন্য, যাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে । 

অতুলের ঘরে এসে দেখে সে বাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে । মঞ্জুলা ওর পথ রোধ করে বলে, সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তুমি মানে আপনি বাজারে যেতে পারবেন না ।স

-- অবাক করে দিলে মঞ্জুলা । আমি ছাড়া ওদের আর কে আছে বলো  ? কে খাওয়াবে ওদের  ? 

-- আমি । 

-- ম ঞ্জু লা তুমি  ? 

-- আপনাকে ভালোবাসি সেই অধিকারে  । 

-- না মঞ্জুলা । আমি আনএমপ্লয়েড । আমি স্বপ্নেও সে কথা ভাবতে পারিনা । 

-- কেন বাধাটা কোথায়  ? আমার তো চাকরিটা রয়েছে । ওতেই আমাদের চলে যাবে । 

-- প্রশ্নটা টাকার নয়, ভালোবাসার  ?

-- আমার হৃদয়ে কি তার অভাব আছে  ? 

-- মঞ্জুলা  ? 

ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকে অতুল । ওর দৃষ্টিতে কিসের জন্য একটা আর্তি  ?




 ( শেষ  )



রথীন্দ্রনাথ রায় 

গীধগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান পিন  713143