ছায়াযুদ্ধের ঘোড়া : ফজলুল হক, দে পাবলিকেশন, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ : প্রণব হাজরা, দাম-২০০ টাকা।

 

ফজলুল হক


সামাজিক দর্শন থেকে মানবিক দর্শন এবং সৃষ্টিতত্ত্বের মহান শূন্যতার উপন্যাস 

🍁

তৈমুর খান 

🌿

 কথাসাহিত্যিক ফজলুল হকের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস 'ছায়াযুদ্ধের ঘোড়া' (কলকাতা বইমেলা ২০২২) এক ভিন্নতর জীবন রসায়নের প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের চরিত্রে সামাজিক ও মানসিক সংঘাত থাকলেও— মেধাবী আলোকসত্তার যে প্রত্যয়ভূমির অন্বেষণ করেছে তা বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখকের মধ্যেই দেখতে পাই। উপন্যাসের ঘটনা প্রসঙ্গ অচ্ছুৎ শ্রেণির নারী-পুরুষকে নিয়ে হলেও অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি লেখকের চরিত্রটি অভিনব বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বরূপে প্রতিফলিত হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন  জাত-ধর্ম-বংশ পরিচয় নয়, মানবিকতার মহিমায় যে কেউ সকলের ঊর্ধ্বে স্থান পাওয়ার যোগ্য।


    লেখকের মনের কারখানায় কীভাবে চরিত্র নির্মিত হয়, তার কলাকৌশল, মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা, আদিমতা, মেধা এবং বাস্তবতা ও অতিবাস্তবতার মাত্রা প্রক্ষেপণ কতখানি প্রয়োজন সবকিছুরই বিশ্লেষণ করেছেন আর তা থেকেই উপন্যাসটির দুটি অংশে 'কটরি' এবং 'শূন্যে'র নির্মাণ করেছেন। তবে দুটি ক্ষেত্রেই লেখক এর গভীর জীবনদর্শন এবং অভিজ্ঞতাই কার্যকরী হয়ে উঠেছে।


   প্রথম অংশে কটরি নামকরণেই সমাজের অচ্ছুৎ শ্রেণির এক যুবতীর নির্মাণ হয় লেখার টেবিলে। তার পদশব্দ শুনতে পান। তার ঘটনাবলীর ঐশ্বর্যভাণ্ডার উন্মুক্ত হয়। তখন নিজেকে 'জাদুকর' মনে হয় লেখকের। যে কটরি মাতাল পিতার দ্বারা অন্ধকারে কর্ষিতা হয় এবং যার জন্য তার পিতা আত্মহত্যা করে। সেই কটরিকেই বিকৃত কামের শিকারে পরিণত করে প্রান্তিক নামে লেখকের এক বন্ধুও। যদিও গ্রাম থেকে শহরে তুলে এনে তার লেখাপড়ার সুযোগ করে দেয়। অনেক পরে লেখক অভিনব-র সঙ্গে তার সাক্ষাত ঘটে। সেই থেকেই তার বাসায় যাতায়াত শুরু হয়। অবিবাহিত লেখক বাড়ির ঝি ফুলনের সঙ্গে শারীরিক মিলনে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রথম জীবনে পাত্তা না দেওয়া কটরিকে পরবর্তী জীবনে পেয়েও প্রথমে তার শরীরে অঙ্গচালনা করেননি। যদিও পারস্পরিক একই বিছানায় চুম্বনরত হয়েছেন। অবশেষে মেধাবিনী কটরি নেট পাশ করে অধ্যাপকের যোগ্যতা অর্জন করলে তার সঙ্গে চরম তৃপ্তির শারীরিক মিলন ঘটেছে। যার ফলে সে গর্ভবতীও। অবশ্য কটরিই তার কাছে সন্তান ভিক্ষা চেয়েছে। এটাই তার কৃতজ্ঞতা। সে নিজেও বলেছে: 'কৃতজ্ঞতা হল এক ধরনের মুক্তি।' তাই শেষ বিদায়টি তার রহস্যময়ই থেকে গেছে। চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছে, আর কখনও সে ফিরে আসবে না। পেটের সন্তানটির পিতৃপরিচয় উহ্য রেখেই লালন-পালন করবে। লেখক ফজলুল হক নিজের লেখা উপন্যাসগুলির নানা প্রসঙ্গ এনেছেন কটরির সঙ্গে আলোচনায়। তার শরীরী বিভঙ্গে যৌন আবেদনের অদ্ভুত বর্ণনাও দিয়েছেন। অপরদিকে কটরি অন্ত্যজ শ্রেণির হলেও বিচক্ষণতায় মহানুভবতায় দূরদৃষ্টির প্রখরতায় উপন্যাসটিতে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। সে জেনে গেছে, 'বিয়ে মানে সমাজ স্বীকৃত ধর্ষণ।' নারী-পুরুষের মিলনও স্বাভাবিক। সেখানে ন্যায়-অন্যায়, শুচি-অশুচি বলে কিছু নেই। যুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই অপরাধ নয়।


     উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশ 'মহাশূন্যের সংলাপ'-এ দেখতে পাই রগরগে বেশ্যাখানায় উৎপাদিত এক সন্তানের মা তার জন্ম মুহূর্তে মারা গেলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাসিরা তাকে লালন-পালন করে। তার পিতৃপরিচয় পাওয়া যায় না। কালো রঙের সন্তান বলে কোনও নিম্নশ্রেণির পুরুষের জন্মা বলে সকলের ধারণা হয়। তাই অবহেলায় তার সঠিক নামকরণও হয় না। যার যা ইচ্ছা সে নামেই ডাকে তাকে। ছোটবেলা থেকেই সে পুরুষদের বিকৃতকাম চরিতার্থের বিভিন্ন পর্যায়গুলি নিজের চোখে দেখে। একটু বড় হলে তাকে অনাথ ছেলেদের সঙ্গে হোমে পাঠানো হয়। সেখানে নিজের মেধাবী আলোকসত্তায় নিসর্গলোককে বিচরণভূমি করে তোলে। প্রকৃতিই তার শিক্ষক হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গৃহহারা হয়ে, শ্রমজীবী হয়ে নানা স্থানে অন্ধকারে আড়ালে-আবডালে বড় হতে থাকে। কিন্তু তার ভাবনার স্তর সাধারণ থেকে অসাধারণের দিকে ধাবিত হয়। সর্বব্যাপী মানব পরিচয়টিই তার দার্শনিকবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। 'জারজ' হিসেবে সমাজ তাকে দেখলে তার উন্নত যে চেতনা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন তা সে টের পায়। অবশেষে বেশ্যাখানার গলু নামে এক যুবতীর মধ্যে তার বিচরণভূমি গ্যালাক্সির দেখা পায়। তার চোখে দর্শিত হয় মোঘল স্থাপত্যের নিদর্শন যা নিসর্গের অলৌকিক শোভায় মঞ্জুরিত। জীবনকে এক শূন্যতার দর্শনেই মিলিয়ে দিতে চায়। জন্ম-মৃত্যুর নথিংনেস ক্রিয়ায় যা সমর্পিত। লেখকের দার্শনিক প্রজ্ঞাটিই এই চরিত্রের ভাবনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই শূন্যের মধ্যেই নিরাবয়ব হওয়ার দর্শনেই এর মূল ভিত্তিটি খুঁজে পান।


     মানবিক চেতনার সঙ্গে আবহমান জীবন প্রক্রিয়ার ধারায় উপন্যাসটি অন্তঃশীল আত্মক্ষরণের ভাষায় আমাদের সমীহ আদায় করে নেয়। সামাজিক দর্শন থেকে মানবিক দর্শনের বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্যের মহাবিস্ময়কে মহাশূন্যতায় পর্যবসিত করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি মহানশূন্যতা এবং মহান নীরবতার প্রেক্ষাপটটি উল্লেখ করেন। এটা একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধিও। আমেরিকান বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক লেখক ওয়েন ওয়াল্টার ডায়ার(১৯৪০-২০১৫)Your Erroneous Zone(১৯৭৬) অর্থাৎ 'আপনার ভুল অঞ্চল' গ্রন্থে লিখেছিলেন:


"Everything that's created comes out of silence. Your thoughts emerge from the nothingness of silence. Your words come out of this void. Your very essence emerged from emptiness. All creativity requires some stillness."


 অর্থাৎ সৃষ্টির যা কিছু নীরবতা থেকে আসে। আপনার চিন্তা-চেতনা নীরবতারই উত্থান। আপনার শব্দ এই অকার্যকর থেকে বেরিয়ে আসে। আপনার সারসত্তা শূন্যতা থেকেই আবির্ভূত। সমস্ত সৃজনশীলতায় কিছু স্থিরতা প্রয়োজন। ফজলুল হক এই নীরবতারই দ্বারপ্রান্তে মহানশূন্যতায় আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন।



🎑


ছায়াযুদ্ধের ঘোড়া : ফজলুল হক, দে পাবলিকেশন, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ : প্রণব হাজরা, দাম-২০০ টাকা। 



(ছবি:ফজলুল হক) 


ফজলুল হক


ফজলুল হক