কী অমোঘ উচ্চারণে ট্রেনে যন্ত্রণার মলম বিক্রি করছেন। শুরুটা ইংরেজি দিয়ে। Man can not live without pain. Because world is painfull.

 

Story and Article

লোকাল ট্রেনে যিশু ও যন্ত্রণার মলম 

সুকুমার হালদার


গভীর নিঃসঙ্গতার ভিতর উল্লাসের ছলকানিতে ভরিয়ে তুলি, মনখারাপের গলিঘুঁজির মেটামরফোসিস অকাল বর্ষন থেমে যায়। অনন্ত ভূখন্ড জুড়ে আনন্দের   রঙীন শুভেচ্ছার ঢেউ ভিজিয়ে দিক। আর কবে, আসবে হে সময়!আমার প্রেমিকার মতো সু-সময় হয়ে কবে লেপ্টে যাবে পৃথিবীর গায়! চিন্তন ভ'রে যায় দীর্ঘশ্বাসের ঢেউয়ে। কখন বায়বীয় হয়ে বয়ে যায় অনন্ত শূন্যে। আমি হাঁ ক'রে তাকিয়ে আছি কতদিন জানি না। চোখের পাতা পড়েনি কত যুগ জানি না।


এক একটা বছর মরে যাওয়ার পাঁচদিন আগে বলতো তোর হেডলাইট বন্ধ কর পাগল। পাগলরা নিঃসঙ্গ না নিঃসঙ্গরা পাগল হয় জানিনা। তবে এটা জানি, বেশিদিন নিঃসঙ্গ থাকতে থাকতে গ্রহণ ও বর্জনের আখ্যান তার ধোঁয়াটে হয়ে যায়। প্রতিটা বছর কেন মরার পাঁচদিন আগে বলতো বুঝতে পারিনি। এখন বুঝতে পারি। অবতার শিরমনি যিশুর জন্মদিনে চোখের পাতা বন্ধ করতে বলতো। যিশুর মৃত্যুর সময়ের নিঃসঙ্গতা আর যন্ত্রণা ...! যাকে বলা যেতে পারে সহ্য শক্তির আধার। 

লোকাল  ট্রেনের এক হকারের কথা মনে পড়ে। কী অমোঘ উচ্চারণে ট্রেনে যন্ত্রণার মলম বিক্রি করছেন। শুরুটা ইংরেজি দিয়ে। Man can not live without pain. Because world is painfull.বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, মানুষ যন্ত্রণা ছাড়া বাঁচতে পারে না। কারণ পৃথিবী যন্ত্রনাময় বা বেদনাময়। সেই শুনে একবারই বিস্ময়করভাবে আমার চোখের পাতা বন্ধ হয়েছিল কয়েক মুহূর্ত কাঁদবার জন্য। কয়েক যুগ পর ওই কয়েক মুহূর্ত কেঁদেছিলাম।


লোকটার কাছ থেকে দশ টাকা দিয়ে একটা যন্ত্রনার মলমের শিশি কিনেছিলাম কোন যন্ত্রনার জন্য আজও বুঝতে পারিনি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম বয়স কত? উত্তরে পেয়েছিলাম ৭৬। এই বয়সে!এই ভিড় ট্রেনে? পুরো প্রশ্ন করতে পারিনি। উত্তরে ভদ্রলোক মিচকি হাসি দিয়ে রবি ঠাকুরের দুইবিঘা জমি কবিতার বিশেষ কয়েক পংক্তি শুনিয়ে বলেছিলেন আমার একমাত্র  মহান সন্তানের অপকর্ম আমাকে টেনে হিঁচড়ে  ট্রেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ট্রেন ছুটছে।ছুটছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আর মাঝে মাঝে নামিয়ে দিচ্ছে। 


কিন্তু আমি নামতে চাই। নামতে পারছিনা। আর তাই নিজের পেটের যন্ত্রনা সারাতে অন্যদের হাত পা কোমর পিঠ ঘাড়ের যন্ত্রণা সারানোর চেষ্টা করছি। বিদায়ের সময় বলেছিলন-একসময় তিনি কলেজে মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। এখন যন্ত্রনার মলমের কারিগর। চোখের পাতা এখনও খোলা আছে আমার। আমি জানিনা, তবে জুডাস নিশ্চিত বলতে পারবে যিশুকে মৃত্যু শলাকা গেঁথে দেওয়ার সময় থেকে আর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় পর্যন্ত চোখ খোলা ছিলো কিনা। তবে হকার ভদ্রলোকের চোখ খোলা আছে আমি সিওর। 


ওই জন্য ভদ্রলোক ট্রেন থেকে নামতে চায় কিন্তু পারছেন না।চোখ খোলা আছে যে। ওনার সন্তান চোখ খুলে দিয়ছে। অনন্ত চোখ খোলা নিয়ে মলম চলেছে এ ট্রেন থেকে ও ট্রেন।এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।কিন্তু প্রান্তের বাইরে যেতে পারছেনা। যিশু পেরেছেন কিনা জানিনা জুডাস জানে। 


আর ট্রেনের মলম- যিশুর সন্তান না জুডাস ওই জানে আদউ নামতে পারবে কিনা! হে সময় স্বমেহনের নৈসর্গিক আনন্দের মতো সুসময় এসো। আমি বেদনার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাতে মেতে থাকব। চোখের ডাক্তারের কথা শুনব না। Nocturnal lagophthalmos সারাব না।


tears dry হোক। আমি আর কাঁদতে চাইনা। যিশুর মতো, মলম ওয়ালার মতো। কাঁদলে জুডাসরা,পিলাতরা কাঁদুক।