সমরেশ কী বাঁশি বাজাতে পারে?

 

Story and Article


ছোটগল্প

মোহনপুর আরোগ্য নিকেতন

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

মোহনপুর আরোগ্য নিকেতন, বর্ধমান . ২৫ নম্বর ঘরের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে, বাইরের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সমরেশ. সে বেশ কয়েক মাস এখানে আছে. এক পথ দুর্ঘটনায় পড়ে তার নাকি স্মৃতি শক্তি হারিয়ে গেছে. নিকট জনদের চিনতেই পারছে না.
বাড়ির লোকজন প্রথমে তার খোঁজ খবর নিতে এলেও --এখন আর কেউ আসে না. তার কেস ফাইলএ লেখা আছে-- নাম -সমরেশ মুখোপাধ্যায়. বাড়ি- দেবগ্রাম , ডাক -রাধা নগর , জেলা -বর্ধমান.বয়স 30. স্কুটারে করে ডি এম অফিসে কাজে যাওয়ার সময় পাশ দিতে গিয়ে -একটি টাটা সুমোর সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে . রক্তাক্ত অবস্থায়, জ্ঞান হারিয়ে, বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে পথচারিদের সাহায্যে ভর্তি হয়.একমাসের চিকিৎসায় প্রায় সুস্থ হয়ে গেলেও বাবা, মা, ভাই, নিকট আত্মীয় কাউকেই চিনতে না পারার জন্য তাকে এই মেন্টাল হাসপাতাল মোহনপুর আরোগ্য নিকেতনে পাঠানো হয়েছে.

কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই সে নার্স এর কাছে প্রায় প্রতিদিনই জিজ্ঞাসা করে, ' সীমা বলে কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে কিনা? তার বাঁশিটাই বা কোথায় গেলো?' নার্স অদিতি প্রথম প্রথম এই দুটি প্রশ্নের উত্তর দিত না. সমরেশকে রাতের ঘুমের ওষুধ দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যেত.

বাড়ি ফিরে অনেক ভেবেচিন্তে একদিন আরোগ্য নিকেতনের সুপার ডাঃ অম্লান নন্দীকে সমরেশের আর কারও কোনও কথা জিজ্ঞাসা না করে শুধুই সীমার কথা আর একটি বাঁশির কথা জানতে চাওয়ার প্রসঙ্গটা বললো. ডাঃ নন্দী বুঝতে পারলেন, সীমা নামে নিশ্চয়ই কেউ আছে এবং সমরেশ তাকে গভীর ভাবে চেনে. ডাঃ নন্দী অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটাও বুঝতে পারলেন সমরেশ বাঁশি বাজাতে পারে. তিনি অদিতিকে বললেন, 'একদিন অফ-ডে'তে বর্ধমান ডি এম অফিসে তোমার দাদা মনোরঞ্জনবাবুর কাছে গিয়ে খোঁজ নাও -ঐ নামে তিনি কাউকে চেনেন কিনা. আমার পরিচিতদের কাছেও আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি. মনে হয় আমরা চেষ্টা করলে সমরেশের মতো এক যুবকের অতীত ফিরিয়ে দিতে পারি.'
একসপ্তাহ পর এক বয়স্ক ব্যক্তি হঠাৎই সমরেশের খোঁজ নিতে এলেন. রিসেপসনিস্ট সঙ্গে সঙ্গে ডাঃ নন্দীকে খবরটা দিল. ডাঃ নন্দী বৃদ্ধ ব্যক্তিটিকে নিজের চেম্বারে নিয়ে গিয়ে বসালেন.বৃদ্ধ পরিচয় দিয়ে জানালেন, 'তিনি সমরেশের বাবা. বাড়ি থেকে তাকে বেরুতে দেয় না. না বলে চলে এসেছেন. সমরেশের মা দিন রাত কাঁদে. একবার বড় ছেলেকে দেখতে চায়. ছোট ছেলে কাউকে আসতে দেয় না. বলে, 'দাদা পাগল হয়ে গেছে.আর ভালো হবে না. '

ডাঃ নন্দী এর পেছনের কারণটা কী জানতে চাইলেন. সমরেশের বাবা মাথা নীচু করে বললেন, ' বিষয় সম্পত্তি নিয়ে কাকাদের সঙ্গে মামলা চলছে. সমরেশ একটি জরুরী কাগজের খোঁজে ল্যান্ড রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টএ আসছিলো. পথে ঐ দুর্ঘটনা ঘটে. আমরা অনেক দেরীতে থানা মারফত খবর পাই. '

ডাঃনন্দী বিনীত ভাবে সমরেশের বাবার কাছে জানতে চাইলেন, সীমা কে?
সমরেশ কী বাঁশি বাজাতে পারে?
-ডাক্তার বাবু, সীমা ওর কলেজের বন্ধু ছিল, ওকে ভালো বাসে সমরেশ. কিন্তু দুর্ঘটনার পর সীমা আর খোঁজ রাখে নি. আর বাঁশি সমরেশের অত্যন্ত প্রিয়. সে শুধু বাঁশি বাজাতেই পারে না, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাজাতেও - যায়.

-ডাক্তার বাবু আপনি আমার ছেলেকে ভালো করে দিন আমি বাড়ি নিয়ে যাবো.
এখন আমি একবার দেখা করতে পারি?
নিশ্চয়ই.
ডাক্তার নন্দী অদিতিকেই দায়িত্ব দিলেন সমরেশের কাছে নিয়ে নিয়ে যেতে.
অদিতি সমরেশের ঘরে নিয়ে গেলো ওর বাবাকে.

সমরেশ তার বাবাকে অবাক দৃষ্টিতে দেখল, কিন্তু চিনতে পারলো না. সমরেশের বাবা নিখিলেশ বাবু সমরেশের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমাকে চিনতে পারছিস না ---আমি তোর বাবা. তোর সেই বাঁশিটা এনেছি, একবার বাজাতো দেখি সেই গানটা 'পুরানো সেই দিনের কথা ---'
না, সমরেশ বাঁশিটা হাতে নিলো কিন্তু বাজাতে পারলো না.

নিখিলেশ বাবুর দু 'চোখ জলে ভরে গেল. অদিতির হাত দুটি ধরে বললেন, ' তুমি পারবে না -সীমা সেজে আমার ছেলেকে ভালো করে দিতে. তোমাকে ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে যাবো মা. '
অদিতি বললো, 'নার্স হিসেবে আমার যত টুকু করার করবো, কোন কিছুর বিনিময়ে নয়.'

এভাবেই ডাঃ নন্দীর অনুমতি নিয়ে অদিতি দিনের পর দিন সীমা সেজে অভিনয় শুরু করলো. বিভিন্ন সূত্রে সমরেশের অতীত জেনে নিলো.

নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেললো. মনে পড়ে গেলো, সুচিত্রা সেনের বিখ্যাত বিয়োগান্ত ছবি 'দীপ জ্বেলে যাই'এর কথা. অদিতি মনে মনে এও ভাবলো বাস্তব আর সিনেমা দুটি এক নয়. জীবনের চিত্র নাট্য মানুষের হাতে থাকে না. তবুও সমরেশের বাবার অনুরোধটা তাকে রাখতেই হবে. ঘর সংসারের লোভে নয় -এক মানবিক ও পেশাগত দায়িত্বের টানে.

কয়েক মাস পরে সমরেশ একদিন বিকেলে বাঁশিটা হাতে তুলে নিলো. সেই জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশিতে বাজাতে শুরু করলো 'পুরানো সেই দিনের কথা -----'

অদিতি নীরবে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে ডাঃ নন্দীকে খবরটা দিল . ডাঃ নন্দী দ্ৰুত ওপরে উঠে এসে সমরেশের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন . পিছু পিছু অনেকেই.
এক অভাবনীয় দৃশ্য সকলকে অবাক করে দিল.

ডাঃ নন্দী আবেগে অদিতির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, তুমি পেরেছো অদিতি. নার্স হিসেবে তুমি সফল. অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার প্রাপ্য.
ডাঃ নন্দী সমরেশের পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলেন -আপনার নাম কী?
উত্তর এলো -সমরেশ মুখোপাধ্যায়.

কিন্তু আমি এখানে কেন? জানালার ধারের শিউলি ফুলের গাছটা ক'মাসে কত বড় হয়ে গেলো. দেখছেন কতফুল এখনও ধরে আছে গাছে. ঝরেও গেছে অনেক ফুল.
সমরেশ বাবু, সীমা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, পাঠিয়ে দোবো?
অদিতি নার্সের ইউনিফর্ম ছেড়ে একটা সুন্দর তাঁতের শাড়ি পরে এসে সমরেশের সামনে এসে দাঁড়ালো.
সমরেশ অদিতিকে দেখে বললো, ' ইনি তো সীমা নন.'
-তবে কে ইনি? ডাঃ নন্দী সমরেশকে জিজ্ঞাসা করলেন.
উনি তো নার্স অদিতি.

ডাঃ নন্দী ও কে বলে চলে গেলেন.সমরেশের বাড়িতে খবর পাঠানোটা জরুরী বলে মনে করলেন.

সমরেশ ধীরে ধীরে অদিতির কাছে এসে দাঁড়ালো. এক প্রশান্ত দৃষ্টি নিয়ে অদিতির দিকে চেয়ে বললো, 'আপনার সেবা, সাহচর্য ছাড়া আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারতাম না. আপনি আমার জীবন সাথী হবেন? 'অদিতি বিনীত ভাবে জিজ্ঞাসা করলো
-কিন্তু সীমার কী হবে? '

আমার দুঃসময়ে যে সাথী হতে পারে নি -একবার এখানে দেখতেও আসে নি --তাই আপনার আপত্তি না থাকলে, আমার দিক থেকে কোন অসুবিধা নেই.
অদিতির দু 'চোখ জলে ভরে গেলো.

ডাঃ নন্দী ঘরে ঢুকে জানালেন, ' সমরেশের বাবাকে সব জানিয়ে দিয়েছি. আগামী কাল সমরেশের ছুটি.ওর বাবা -মা আসছেন.

কিন্তু অদিতির ছুটি নয়. নতুন জীবন শুরুর জন্য আমার আগাম শুভেচ্ছা রইলো.'
উপস্থিত অন্যান্য সকলেই অদিতিকে কৃতজ্ঞতা জানালো.